বাংলাদেশ, শনিবার, এপ্রিল ১৮, ২০২৬

আজ মহান বিজয় দিবস

৫৪ বছরেও রাজনৈতিক অর্থনৈতিক মুক্তি মেলেনি
NewsPaper

স্বদেশ বানী ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০৭:৪৪ অপরাহ্ণ

আজ মহান বিজয় দিবস

লাল-সবুজের রঙতুলিতে আঁকা ৫৬ হাজার বর্গমাইলের মানচিত্র ও একটি পতাকা। ১৮ কোটি মানুষের আবেগে মোড়ানো স্বাধীন বাংলাদেশ। কিনতে হয়েছে সীমাহীন মূল্য দিয়ে। এত দাম দিয়ে আর কোনো দেশ কিনতে হয়নি। সেই বিজয়ের ৫৪ বছর আজ ১৬ ডিসেম্বর। বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বাধীনতার উদ্দেশ্য ছিল দুটি। দেশের মানুষের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তি। শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং মানুষের অধিকারের পক্ষে ছিল এ যুদ্ধ। এত বছরে সামষ্টিক অর্থনীতিতে অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতি ও বৈষম্য কমেনি। অর্থাৎ কিছুটা অগ্রগতি হলেও অর্থনৈতিক মুক্তি মেলেনি। আর রাজনৈতিক মুক্তির পথে সবচেয়ে পিছিয়ে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতা রক্ষায় ২০২৪ সালে আবারও দেশের মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে। এখনো দেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দুর্নীতি রোধ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। মানুষের ভোটের অধিকার, বাকস্বাধীনতা, সুষ্ঠু নির্বাচন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার এখনো নিশ্চিত হয়নি।

এই ব্যর্থতার দায় রাজনৈতিক দলের। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতাকে সম্পদ বাড়ানোর হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছে। আবার সম্পদ বিদেশে পাচার করে দেশকে পঙ্গু করেছে। তবে তাদের মতে, দেশের সম্ভাবনা বিশাল। মোট জনশক্তির দুই-তৃতীয়াংশ মানুষই তরুণ। দেশকে এগিয়ে নিতে তারা কাজ করে যাচ্ছে। আর এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর সেই সম্ভাবনার দিকে তাকিয়ে আছে সাধারণ মানুষ।

জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে উন্নয়ন হয়েছে, বিশেষত অবকাঠামো খাতে। তবে অনেক ক্ষেত্রে উন্নতি হয়নি, বরং অবনতি হয়েছে। যে অঙ্গীকারের ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণ দিয়েছিলেন-বাংলাদেশের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা-সেটি থেকে আজ আমরা যোজন যোজন দূরে। বস্তুত আমরা যেন আজ এক পথ হারানো জাতি। এক্ষেত্রে আমার সুপারিশ হলো-নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান, মানবাধিকার সংরক্ষণ, সমতা-ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠা, স্বজনতোষণের অবসান, দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের লাগাম টানা, দলীয়করণের অবসান ইত্যাদি। আর এর জন্য প্রয়োজন হবে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা ও কতগুলো সুদূরপ্রসারী সংস্কার।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গল্পটা সত্যিই বিশ্বের কাছে চির বিস্ময়কর। পৃথিবীতে দুঃসাহসী মানুষের অবিশ্বাস্য বাস্তবতার গল্প এটি। অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের মনোবল ও সাহসের কাছে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের এ দিনেই হানাদাররা আত্মসমর্পণ করে। আর এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন মুক্তিযুদ্ধে বিজয়। মহান সেই বিজয় দিবসের ৫৪তম বার্ষিকী আজ। শহীদদের রক্তের বিনিময়ে এই মাতৃভূমি বাংলাদেশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আবেগ, ভালোবাসা ও স্বপ্ন। সামাজিক সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। শিক্ষার হার, নারীর ক্ষমতায়ন ও মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। অর্থনীতিতেও এগিয়েছে। ইতোমধ্যে মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি মিলেছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পথে। অগ্রগতি আছে কৃষিতে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ইলিশ উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম, তৈরি পোশাকে দ্বিতীয়, পাট রফতানিতে প্রথম ও উৎপাদনে দ্বিতীয়, কাঁঠাল উৎপাদনে দ্বিতীয়, চাল, মাছ ও সবজিতে তৃতীয়, ছাগল উৎপাদনে চতুর্থ, আম ও আলুতে সপ্তম, ক্রিকেটে, আউটসোর্সিং ও বাইসাইকেল রফতানিতে অষ্টম, পেয়ারা উৎপাদনে নবম এবং মৌসুমি ফলে দশম অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু এখনো বড় সমস্যা বৈষম্য। দেশের ৫২ শতাংশ সম্পদ ৫ শতাংশ মানুষের কাছে। এর উল্লেখযোগ্য অংশ দেশের বাইরে পাচার হয়েছে। আর এই বৈষম্যের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ দুর্নীতি। ইতোমধ্যে দুর্নীতিতে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবু আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫৪ বছর। কিন্তু যে উদ্দেশ্য নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, এখনো সেই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তি মেলেনি। কিন্তু আমাদের সঙ্গে একই সময়ে স্বাধীন হয়ে কয়েকটি দেশ অনেকদূর এগিয়েছে। বাংলাদেশ ওইসব দেশের চেয়ে পিছিয়ে। এটি আমাদের ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতার দায় রাজনৈতিক দলগুলোর। তারা বিভিন্নভাবে দুর্বৃত্তায়ন কায়েম করেছে। তিনি বলেন, বর্তমানে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বড় একটি ফাঁদে পড়েছে। বিশেষ করে গত ১৫ বছরে অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে ক্ষমতাসীনরা বিদেশে অর্থ পাচার করেছে। দেশের আর্থিক খাত পঙ্গু করে ইউরোপ-আমেরিকায় অর্থের পাহাড় গড়ে তুলেছে। অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ৫৪ বছরে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যেখানে পৌঁছেছে, তা দুঃখজনক। দারিদ্র্য পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। বৈষম্য সীমাহীন। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা খারাপ অবস্থায়। যেমন-বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ রাজস্ব আয় হয়, তার পুরো টাকাই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় চলে যায়। ফলে উন্নয়ন বাজেট পুরোটাই ঋণনির্ভর। তিনি বলেন, বর্তমানে ১৩০ বিলিয়ন ডলার বিদেশি ঋণ রয়েছে। এরপর রয়েছে দেশীয় উৎস থেকে সরকারের ঋণ। ফলে বাজেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়ের খাত ঋণের সুদ পরিশোধ। বর্তমানে রাজস্ব বাজেটের ২৫ শতাংশের সমান অর্থ সুদ পরিশোধে চলে যায়। তার মতে, যেহেতু আমাদের রাজস্ব আয় কম, তাই ঋণ করতে হচ্ছে এবং ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এটি একেবারেই অস্বাভাবিক। আগামীতে যে দল ক্ষমতায় আসবে, তাদের এই পরিমাণ ঋণ নিয়ে দেশ চালানো কঠিন হবে। প্রতি বছর রপ্তানি আয় ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি না হলে সরকারের টিকে থাকা কষ্টকর হবে।

আবু আহমেদ আরও বলেন, সবচেয়ে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে দেশের আর্থিক খাত। ব্যাংকগুলো লুট করে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। ৮০ শতাংশের বেশি লিজিং কোম্পানি দেউলিয়া। বিমা কোম্পানিরগুলোর দাবি পরিশোধের সক্ষমতা নেই। শেয়ারবাজার লাইফ সাপোর্টে। উন্নয়নের নামে দেশের অর্থ লুট করা হয়েছে। রাশিয়ার সহায়তায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তার মতে, যত বড় প্রকল্প, তত বড় দুর্নীতি। এই দুর্নীতির টাকাই বিদেশে পাচার করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিষয় হলো রাজনৈতিক মুক্তি। এই রাজনৈতিক মুক্তিও মেলেনি। এর পেছনে রাজনীতিবিদরাই দায়ী। গত ১৫ বছরে দেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বলতে কিছু ছিল না। সবকিছু দিল্লির নীতিতে, অর্থাৎ প্রতিবেশী ভারত যা বলেছে, সেভাবেই চলেছে। বৃহৎ প্রতিবেশীর কাছে শর্তহীনভাবেই সবকিছু বিলীন করে দেওয়া হয়েছে। এর কারণ হলো, ওই সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত ছিল না। টিকে থাকতে তাদের ভারতের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়েছে। এছাড়াও ভোটের অধিকার, ভাতের অধিকার এবং মানুষের বাকস্বাধীনতা সবকিছু কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। মানুষের নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা কোনো কিছুই স্বাভাবিক ছিল না। ’৭১ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যবসা করা হয়েছে। এই ব্যবসার নাম দিয়ে সব অন্যায়-অত্যাচার এবং ভিন্নমতের ওপর নির্যাতনের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের মোট জনশক্তির ৬০ ভাগই জন্ম নিয়েছে ১৯৭১ সালের পর। তারা উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ চায়। ফলে শুধু চেতনার নাম করে তাদের বিভ্রান্ত করা যাবে না।

তবে সামনের দিনগুলোতে রয়েছে চ্যালেঞ্জ। সম্পদ, আয় এবং ভোগের ক্ষেত্রে সীমাহীন বৈষম্য রয়েছে। মোট সম্পদের প্রায় ৫২ শতাংশই উচ্চ শ্রেণির ৫ শতাংশ মানুষের হাতে। আর নিু শ্রেণির ৫ শতাংশ মানুষের হাতে মাত্র দশমিক ০৪ শতাংশ। দুর্নীতি প্রতিরোধ, অর্থ পাচার বন্ধ করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সুষ্ঠু নির্বাচন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিশ্চিত করাই হবে মূল কাজ। এগুলো সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর দূরত্ব কমানো।

জানতে চাইলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান যুগান্তরকে বলেন, স্বাধীনতার মূলনীতি চারটি। এগুলো হলো-গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা। কিন্তু এগুলোর কোনোটা নেই। দেশে গণতন্ত্র অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়েছে। আর সমাজতন্ত্র কোথাও নেই। সামাজিক ন্যায়বিচার ক্ষয়িষ্ণু হয়েছে। সমাজের কেউ কাউকে মানছে না। আগে মানুষ ঘুস-দুর্নীতি আড়ালে করত। কিন্তু এখন প্রকাশ্যে করে। দুর্নীতিবাজ, মাস্তানরা মন্ত্রী-এমপি হচ্ছেন। আমরা তাদের সম্মান করছি। আর জাতীয়তাবাদের ক্ষেত্রে দুই ভাগে বিভক্ত। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সরকারের আমলে পরিস্থিতি যা ছিল, বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বর্তমানে সব সূচকে নিচে নেমে গেছে বাংলাদেশ। তবে সামগ্রিক বিবেচনায় ৫৪ বছরে বাংলাদেশের বেশকিছু অর্জন আছে। প্রথমত, অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়ন হয়েছে। মানুষের গড় আয়ু সচেতনতা বেড়েছে। শিক্ষার হার বেড়েছে। অর্থনৈতিকভাবে মানুষ অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। এছাড়াও বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের পরিচিতি বেড়েছে।