জুলাই আন্দোলন দমনে হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়া হয়েছিল। গত বছরের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টারের ৩৬টি ফ্লাইট উড্ডয়ন করে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হেলিকপ্টারের এসব ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। হেলিকপ্টার থেকে যে গুলি করা হয়েছে, এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর কাছ থেকে ‘ডিটেইলড ফ্লাইট চার্টার’ সংগ্রহ করা হয়েছে। সে হেলিকপ্টারগুলোর কতক্ষণ ফ্লাইট ডিউরেশন ছিল, ফ্লাইটগুলো অপারেট করেছেন কোন কোন পাইলট, তাদের নাম ও ফোন নম্বর পাওয়া গেছে। সেখানে পাইলট ছাড়া আর কোন কোন সৈনিক বা অফিসার যাত্রী ছিলেন তারও পরিচয় জানা গেছে। সেখানে কী কী অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে, কত রাউন্ড গুলি করা হয়েছে, তারও তালিকা রয়েছে। বুধবার চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ এসব তথ্য তুলে ধরেন। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) কাছ থেকে পাওয়া একটি প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে বলে জানান তিনি।
তাজুল ইসলাম বলেন, সেখানে ব্যবহৃত এসএমজি, লাইট মেশিনগান, শটগান, রাইফেল, সাউন্ড গ্রেনেড, স্টান গ্রেনেড সবকিছুর হিসাব আছে। এদিন ভিডিও ফুটেজ, আহতদের গুলিবিদ্ধ হওয়া, শহীদ এবং আহতদের শরীর থেকে যে বুলেটগুলো বের করা হয়েছে, তা আদালতে উপস্থাপন করেন তিনি।
জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষে চতুর্থ দিনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন তাজুল ইসলাম।
প্রসঙ্গত, কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়, ঠিক তখন থেকেই রাজধানীর বেশ কয়েকটি জায়গায় হেলিকপ্টার থেকে গুলি করার অভিযোগ ওঠে র্যাবের বিরুদ্ধে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ যুক্তিতর্ক অসমাপ্ত অবস্থায় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন ধার্য করেন। এদিন এই মামলার পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে চারটির যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। এদিন গত বছরের ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ী এলাকায় পুলিশ কর্তৃক ১৯ জন আন্দোলনকারী হত্যা, চানখাঁরপুলে ৬ জন হত্যা ও আশুলিয়ায় ৬ আন্দোলনকারীকে পুড়িয়ে হত্যার ভিডিও ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করা হয়। শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলনে ‘ওয়াইড স্প্রেড অ্যান্ড সিস্টেমেটিক’ পদ্ধতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমসের ডেফিনেশন অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো অপরাধ কোনো একটি জায়গায় সংঘটিত হয়ে সেটি সারা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। সব হত্যাকাণ্ড একই প্যাটার্নে হয়। এটাই হলো সিস্টেমেটিক অ্যান্ড ওয়াইডস্প্রেড।
তিনি বলেন, ওয়াইড স্প্রেড অপরাধটি কেবল একটি স্থানে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। আর সিস্টেমেটিক অপরাধগুলো একটি কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা বা নির্দেশনার অধীনে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা প্যাটার্ন অনুসরণ করে সংঘটিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, হেলিকপ্টার থেকে ছত্রী সেনা নামানো বা ওপর থেকে বোমা হামলা করার মতো ঘটনাগুলো এই ধরনের একটি পদ্ধতির অংশ। যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
হত্যার নির্দেশনার ব্যাপারে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, নির্দেশটা যে সত্যিকার অর্থে শেখ হাসিনা দিয়েছিলেন, পুলিশ বাহিনীর তৎকালীন প্রধান সরাসরি আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন যে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা, হেলিকপ্টার ব্যবহার করার নির্দেশনা তিনি পেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেছিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে টেলিফোন করে জানান প্রধানমন্ত্রী তাকে এ নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি তখন এ নির্দেশটি তার অধস্তন কর্মকর্তাদের জানান। অধস্তন কর্মকর্তারা অর্থাৎ ডিএমপির তদানীন্তন কমিশনার হাবিব, প্রলয় জোয়ার্দার-তারা কমান্ড সেক্টরের মাধ্যমে, ওয়্যারলেস মেসেজের মাধ্যমে বিভিন্ন কমান্ড পোস্ট, বিভিন্ন জায়গায় যেসব বাহিনীকে নিয়োগ করা হয়েছে, তাদের কাছে পৌঁছে দেন। এই নির্দেশ সুনির্দিষ্টভাবে উপর থেকে ক্রমান্বয়ে নিচে এসেছে এবং তা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়েছে। অপরাধগুলো ছিল ‘ওয়াইডস্প্রেড’ এবং ‘সিস্টেমেটিক’। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, দেশীয় আইন অনুযায়ী একটা অপরাধকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হওয়ার জন্য ওয়াইস্প্রেড এবং সিস্টেমেটিক হওয়ার যে শর্ত, সে শর্ত পরিপূরণ সম্পূর্ণভাবে এ মামলায় প্রমাণিত হয়েছে।
যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন চিফ প্রসিকিউটর। তিনি দাবি করেছেন, শেখ হাসিনা তিন ব্যক্তির সঙ্গে কথপোকথনে নিশ্চিত করেছেন যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তিনি প্রাণঘাতী অস্ত্র (ল্যাথাল উইপন) ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন। ‘তিনি (শেখ হাসিনা) ড্রোন ব্যবহার করে অবস্থান শনাক্ত করে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে হত্যারও নির্দেশ দিয়েছেন। হাসানুল হক ইনুকে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, নারায়ণগঞ্জে হেলিকপ্টার থেকে ছত্রীসেনা নামানো হবে এবং উপর থেকে ‘বম্বিং’ করা হবে, ‘প্যারাট্রুপার’ নামানো হবে।’
তাজুল বলেন, ‘এসব কথোপকথনের মধ্য দিয়ে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার অর্থাৎ সারা দেশব্যাপী ‘ওয়াইডস্প্রেড’ এবং ‘সিস্টেমেটিক’ যে হামলার কথা আমরা বলছি, সেটি সংঘটনের জন্য তার (শেখ হাসিনা) সরাসরি নির্দেশ প্রমাণিত হয়েছে।’