মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ঢাকা
ফন্টসাইজ A- A A+
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
উত্তরাঞ্চলের খবর

তানোরে সার সিন্ডিকেটে দিশেহারা আলু চাষীরা

সারোয়ার হোসেন, তানোর
প্রকাশ: ২০-১০-২০২৬, ০৪:৫২ AM
০ বার পঠিত
তানোরে সার সিন্ডিকেটে দিশেহারা আলু চাষীরা

উত্তর বঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলু চাষ হয় রাজশাহীর তানোর উপজেলায়। কিন্তু আলু মৌসুমে প্রতি বছর সার সিন্ডিকেটের কবলে পড়তে হয় আলু চাষীদের। ন্যায্য দামে প্রয়োজনীয় সার মিলেনা চাষীদের কপালে। অথচ বাড়তি দাম দিলেই মিলে চাহিদা মত সার। বাড়তি দামের কারনে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। প্রতি আলু মৌসুমে একই ধরনের সার নিয়ে সিন্ডিকেট হলেও রহস্য জনক কারনে নির্বিকার কৃষি দপ্তর। প্রকাশ্যে দিবা লোকে বছরের পর বছর সিন্ডিকেট হলেও প্রতিকার নেই কৃষি দপ্তরে। আবার রাজনৈতিক নেতাদের চাহিদা মত সার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন কৃষি অফিসের কর্তা থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের বিএসরা বলেও অহরহ অভিযোগ রয়েছে। এতে করে সার পাওয়া নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়েছেন প্রান্তিক আলু চাষীরা।

জানা গেছে, গত মৌসুমে আলু চাষ করে প্রচুর লোকসানের মুখে পথে বসেছেন হাজারো আলু চাষীরা। সেই লোকসান পুষিয়ে নিতে পুনরায় কোমর বেধে আলু চাষের প্রস্তুতি চলছে। আবার অনেক চাষী সার না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ছেন। গত বৃহস্পতিবার আলু চাষী তানোর পৌর এলাকার আব্দুল মালেক সার পেতে কৃষি অফিসারের সাথে কথা বলতে আসেন। দুপুর ১২ টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও কৃষি অফিসারের দেখা পাননি। হতাশ হয়ে ফিরে যান তিনি।

দুপুর একটার দিকে তালন্দ এলাকার ইমরুল হকও সার না পেয়ে কৃষি অফিসারের সাথে দেখা করতে আসেন। অবশ্য তিনি অফিসারের দেখা পান। কৃষক ইমরুল জানান ১৫/১৬ বিঘা নিজস্ব জমিতে আলু চাষ করব। কিন্তু কোনভাবেই সার পাওয়া যাচ্ছে না। একারনে অফিসারের সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছি। যদি কোন প্রতিকার পাওয়া যায়।

গত শনিবার গোল্লাপাড়া বাজারে কৃঞ্চপুর এলাকার আলু চাষী তরিকুলের সাথে দেখা হয়। তিনি জানান কয়ক বিঘা জমিতে আলু চাষ করব। কিন্তু সার মিলছে না। ডিলার বা ব্যবসায়ীদের কাছে গেলে সার নাই বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। আবার বাড়তি দামে সার ঠিকই মিলছে। প্রতি আলু মৌসুমে একই ধরনের সিন্ডিকেট হলেও কোন প্রতিকার নেই।

কলমা ইউপির এক কৃষক নাম প্রকাশ না করে জানান,  ১৮০০ বস্তা সার কিনেছে বাড়তি দামে। ১৪০০ টাকার টিএসসি ১৮০০ টাকায়, ১০৫০ টাকার ডিএপি ১৪০০/১৪৫০ টাকায় এবং পটাশ ১১০০/১১৫০ টাকায়। কোন ডিলার বা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি জানান, নাম বলা যাবেনা। তালন্দ বাজার থেকে সংগ্রহ করেছি। বাড়তি দাম ছাড়া কোথাও চাহিদা মত সার মিলছে না। এটা অপেন বিষয় হয়ে পড়েছে। 

চাষীরা জানান, প্রায় সার ডিলার বা বালাইনাশক ব্যবসায়ীরা পার্শ্ববর্তী মান্দা, মোহনপুর, নাচোল, নিয়ামতপুর, গোদাগাড়ী উপজেলা এবং  নওগাঁ সদর ও চাপাইনবয়াবগঞ্জ জেলা সদরসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে চোরাই পথে প্রতি নিয়তই সার আসছে। কৃষি কর্মকর্তা  আলু চাষীদের চাহিদা পূরনের জন্য বাহির থেকে সার আমদানির মৌখিক অনুমতি দিয়েছেন। এসুযোগ কাজে লাগিয়ে বাহির থেকে সার এনে বাড়তি দামে বিক্রি করে নিজেরা পকেট ভরছেন, আর চাষীদের পকেট ফাঁকা করছেন। নির্দিষ্ট দাম বেধে দিলে এত বেপরোয় দাম নিতে পারত না। অফিস কে ম্যানেজ করেই ব্যবসায়ীরা এধরণের কাজ করতে মরিয়া হয়ে পড়েছেন। সরকারি দামে সার নিতে ডিলারের দোকানের সামনে দীর্ঘ লাইন ধরে যত সামান্য সার কারো ভাগ্যে মিলছে, আবার কেউ শূন্য হাতে ফেরত যাচ্ছে। 

রনি নামের আরেক চাষী জানান, গত বছর ৮ বিঘা আলু করে ৭/৮ লাখ টাকা লোকসান। এবারে তিন বিঘা জমিতে আলু চাষ করব কিন্তু সার পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি মূল্যে কোনভাবেই সার পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়তি দাম দিলেই মিলবে সার। 

বিএডিসি সার ডিলার সমিতির সভাপতি আব্দুল মতিন জানান, কৃষকের চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ একেবারেই কম। এজন্য বহির থেকে বাড়তি দামে এনে বাড়তি দামে বিক্রি করে কৃষকের চাহিদা পূরন করছে ব্যবসায়ীরা। 

পাঁচন্দর ইউনিয়ন ইউপির বিসিআইসির সার ডিলার প্রনব সাহা জানান, যতটুকু বরাদ্দ পাব সেটাই সরকারি মূল্যে বিক্রি করব। শুনছি অনেকে বাহির থেকে সার এনে বাড়তি দামে বিক্রি করছে। এটা শুধু তানোরে চিত্র না যে এলাকায় আলু চাষ হচ্ছে সে এলাকায় সারের চিত্র এমন।

কৃষি অফিসেী এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, বাহির থেকে সার আছসে, বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে সবাই অবহিত। কিন্তু কিছুই করনীয় নাই। বাহির থেকে সার না এলে কোনভাবেই আলু চাষ হবে না। আর এসব নিয়ে অভিযান পরিচালনা করলে অফিস পুড়িয়ে দিবে চাষীরা। অভিযান পরিচালনা করে ব্যবসায়ীদের জরিমানা করলে তারা সার আনবে না চাষও হবেনা। সরকার বলুক যে পরিমান সার হলে কৃষকের চাহিদা মিটবে সে পরিমাণ দেয়া হবে, তা বলবে না। আশপাশের অনেক উপজেলায় আলু চাষ হয়না ওই সব এলাকার বরাদ্দ কেটে এউপজেলায় দিলেও অনেক সংকট কেটে যাবে। কিন্তু সেটা করবেনা। আবার যে পরিমান সার ব্যবহার হয় তাতে করে অল্প সময়ের মধ্যে জমি তার উর্বরতা হারাবে। 

উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা যায়, এবারে উপজেলায় আলু চাষের লক্ষমাত্রা ১২ হাজার ১৯০ হেক্টর জমি। গতবারের চেয়ে ১২০০ হেক্টর কম জমি লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। 

অতিরিক্ত কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সুভাষ কুমার মন্ডল জানান, আমরা সরকারি নিয়মের বাহিরে বরাদ্দ পায়না। সারা বছরের বরাদ্দ দিয়েও আলু চাষে সারের চাহিদা মিটবে না। কারন কৃষকরা জৈব সার ব্যবহার করেনা। মাত্রাতিরিক্ত সার কীটনাশক ব্যবহার করে থাকে। টেন্ডারের জমি বেশি ফলনের জন্য অতিরিক্ত সার ব্যবহারের কারনে প্রচুর পরিমানে সারের প্রয়োজন। ডিসেম্বর মাসের জন্য সার বরাদ্দ হয়েছে টিএসপি ২৯০ মে:টন, ডিএপি ১০৯০ মে:টন, পটাশ ৭০০ মে:টন ও ইউরিয়া ১৪৫৯ মে:টন। যা দু চার জন প্রজেক্ট চাষীদের চাহিদা। কিন্তু কিছুই করনীয় নাই। সরকারি নিয়মের বাহিরে বরাদ্দ দেয়না। তবে পরামর্শ থাকবে অতিরিক্ত জৈব সার ব্যবহার করে জমির উর্বরতা ধরে রাখা। 


লিংক কপি হয়েছে