শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক আনসার উদ্দিন।
রাজশাহীর নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (এনবিআইইউ) সাময়িক বরখাস্ত প্রক্টর এ জে এম নূর-ই-আলমকে স্থায়ী বরখাস্তের সিদ্ধান্ত হয়েই গেছে। বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা ২০ মিনিটের দিকে শিক্ষার্থীদের সামনে এমন ঘোষণাই দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক আনসার উদ্দিন। অথচ এর মাত্র ঘণ্টাখানেক আগে ই-মেইলের মাধ্যমে অভিযুক্ত শিক্ষক নূর-ই-আলমের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে ব্যাখা চাওয়া হয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যারা যাবে, তাদের ছাত্রত্ব বাতিল করা হবে- এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলার সময় এমন হুমকি দেওয়াসহ বেশকিছু অভিযোগের তদন্ত চলছে নূর-ই-আলমের বিরুদ্ধে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। চলতি বছরেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দায়িত্ব পান। তাঁর দাবি, তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। তাঁর ফেসবুক আইডিতেও সেই প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে সম্প্রতি একটি ফোনকল রেকর্ড ফাঁস হয়, যেখানে নূর-ই-আলমের মতো কণ্ঠের এক ব্যক্তিকে হুমকি দিতে শোনা যায়। নূর-ই আলমের দাবি, এটি এআই দিয়ে তৈরি।
এই অডিও এবং অন্যান্য আরও বেশকিছু অভিযোগ সামনে এনে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন। গত সোমবার মহাসড়কও অবরোধ করা হয়। পরদিন নূর-ই আলমকে সাময়িক বরখাস্ত করে কর্তৃপক্ষ। সেদিন তিনজন ছাত্র প্রতিনিধিসহ সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয় তাদের।
কিন্তু বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদন না এলে বিকেলে আবারও ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য আনসার উদ্দিন গিয়ে হ্যান্ডমাইকে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘শোনো, কমিটির যে সভাপতি সে আমাকে বলেছে যে তাকে স্থায়ী বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছে। আইনগত সমস্যার জন্য আমরা অফিশিয়ালি ঘোষণাটা কালকে দেব।’
তিনি বলেন, ‘তাকে স্থায়ী বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। অফিশিয়াল ঘোষণা আমরা কালকে দেব, আইনগত সমস্যার জন্য। না হলে সে কোর্টে গিয়ে স্টে অর্ডার করে বসে বসে বেতন পাবে। আইনগত যে জটিলতা আছে, ওইগুলো আমরা দেখে কালকে ১২টার মধ্যে আমরা ঘোষণা দেব।’
এ সময় শিক্ষার্থীরা বলতে থাকেন, ‘এটা লিখিত দিতে হবে।’ তখন উপাচার্য আনসার উদ্দিন শিক্ষার্থীদের বলেন, ‘এইটাই তোমরা ভিডিও করে রাখো। এইটাই অফিশিয়াল ঘোষণা। তাকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়েছে, এইটাই কমিটি আমাকে বলেছে। আইনগত কিছু জটিলতার জন্য আমাদের একটু সময় লাগবে। আমি ভিসি হিসেবে তোমাদেরকে বলছি।’
এ সময় ‘এই তালি দাও, তালি দাও’ বলে শিক্ষার্থীরা তালি দেন। পরে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘তদন্ত কমিটির কাছে পরিষ্কার সে (নূর-ই-আলম) দোষ করেছে। সে জুলাইয়ের বিরুদ্ধে কথা বলে, ছাত্রদের হুমকি দেয়, ছাত্রদের তুলে নিয়ে গিয়ে মারে, সবকিছু প্রমাণিত।’ আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘অলরেডি সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে তাকে বহিষ্কারের। অলরেডি নোটিশও তৈরি করা হয়েছে। শুধু একটু আইনি জটিলতার কারণে প্রকাশ হবে আগামীকালকে।
এ বিষয়ে সাময়িক বরখাস্ত প্রক্টর এ জে এম নূর-ই-আলম বলেন, ‘তারা সবকিছু পরিকল্পনা করেই ফেলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্থায়ী বরখাস্তের ঘোষণা দিচ্ছেন বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে, আর আমার কাছে ব্যাখা চাওয়া হয়েছে ২টা ৭ মিনিটে। এতে ১১টি অভিযোগ তুলে ধরে দুই ঘণ্টার মাথায় বিকেল ৪টায় জবাব দিতে বলা হয়। আমি ই-মেইল করে একটু সময় চেয়েছি। তারা ফিরতি মেইলে আগামীকাল (শুক্রবার) সকাল ১০টা পর্যন্ত সময় দিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের উপাচার্য এবং তদন্ত কমিটি যখন আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার আগেই অভিযুক্ত করে ফেলেন, তখন আসলে এই তদন্ত এবং ব্যাখা চাওয়া লোকদেখানো। কারণ, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আসার আগে কেউ এ ঘোষণা দিতে পারেন না।’
জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য আনসার উদ্দিন বলেন, ‘বাস্তবতা বোঝেন তো। ওখানে এমন সিনক্রিয়েট করেছে, আমাদের ঘোষণা না দিয়ে আসাই সম্ভব না। কমিটি আমাকে বলেছে এটা।’ তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই সেটা বলা যায় কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা তদন্ত কমিটির কাছেই জিজ্ঞেস করুন।’ তদন্ত কেমন হবে, এ প্রশ্নে বলেন, ‘সেটা পরে দেখা যাবে।’
তদন্ত কমিটির প্রধান রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মকসুদুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের থামানোর জন্য এটা (স্থায়ী বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের কথা) বলতে হয়েছে। তবে আমরা কাজ করছি। তিন দিন ধরে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য গ্রহণ করেছি। এখন শুধু রাইট-আপ বাকি। আগামীকাল অভিযুক্ত ব্যক্তির ব্যাখা আসবে। তারপর আমরা প্রতিবেদন লিখব।