বাংলাদেশ, বুধবার, মে ১৩, ২০২৬

বাইক ও ব্যাটারি অটোরিকশা চালালেও দিতে হবে কর

NewsPaper

স্বদেশ বানী ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ মে, ২০২৬, ০২:৩৫ অপরাহ্ণ

বাইক ও ব্যাটারি অটোরিকশা চালালেও দিতে হবে কর

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে নতুন করে করের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। মোটরসাইকেলে সিসিভেদে বছরে দুই হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা এবং এলাকাভেদে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর আরোপের প্রস্তাব থাকছে।

একই সঙ্গে ভ্যাট ব্যবস্থায় সহজীকরণ, নতুন নিবন্ধিত ব্যবসার জন্য প্যাকেজ সুবিধা, কিছু খাতে ভ্যাট অব্যাহতি এবং কিছু ক্ষেত্রে ভ্যাট বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকেও করের আওতায় আনতে চায় সরকার। প্রস্তাব অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় চলাচলকারী অটোরিকশার জন্য বছরে পাঁচ হাজার টাকা, পৌরসভা এলাকায় দুই হাজার টাকা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে এক হাজার টাকা কর নির্ধারণ করা হতে পারে।

বাইক ও ব্যাটারি অটোরিকশাও আসছে করের আওতায়

তবে এই খাতের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিবন্ধন ব্যবস্থা না থাকা। কয়েকটি অটোরিকশা সংগঠনের হিসাবে কেবল রাজধানীতে ১০ থেকে ১৪ লাখ অটোরিকশা চলাচল করছে। আর সারা দেশে বর্তমানে ৫০ থেকে ৭০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রয়েছে। এসব যানকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে সরকার গত বছর ‘বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫’-এর খসড়া তৈরি করে। সেখানে নিবন্ধন সনদ, ফিটনেস সনদ ও ট্যাক্স টোকেন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে।

জানতে চাইলে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম নাদিম বলেন, এই বাহনকে রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনার মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়া হলে এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। পাশাপাশি সারাদেশে প্রায় ৭০ লাখের মতো রিকশা -অটোরিকশা আছে, তাদের কাছ থেকে ন্যূনতম কর নেওয়া হলে দেশের রাজস্ব খাতে পরিবর্তন আসবে। আর ব্যাটারিচালিত মোটরযান আমদানি বা এর ব্যাটারি কিংবা অন্যান্য সরঞ্জামাদিতে কর বাড়ালে এই খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, অটোরিকশায় কর বসানোর উদ্যোগ বাস্তবায়ন খুবই কঠিন হবে। কেননা কত অটোরিকশা ঢাকায় বা সারা দেশে চলাচল করেছে, কারা চালায় তার কোনো সঠিক হিসাব বা পরিসংখ্যান নেই। তবে এসব যানের ব্যাটারি আমদানিতে করভার বাড়ানো উচিত। কেননা নিম্নমানে ব্যাটারিতে দেশ সয়লাব হয়ে গেছে। এতে বাড়ছে দুর্ঘটনা।

বাইক ও ব্যাটারি অটোরিকশাও আসছে করের আওতায়

এছাড়া প্রথমবারের মতো মোটরসাইকেলের ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ১১০ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেলে কোনো কর দিতে হবে না। তবে ১১১ থেকে ১২৫ সিসির বাইকে বছরে দুই হাজার টাকা, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসির ক্ষেত্রে পাঁচ হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর দিতে হবে।

বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৪৮ লাখ ৭০ হাজার। এর মধ্যে করযোগ্য বাইকের সংখ্যা প্রায় ৩৮ লাখ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গড়ে প্রতিটি বাইক থেকে চার হাজার টাকা করে কর আদায় করা গেলে সরকারের কোষাগারে বছরে প্রায় ১ হাজার ৫২০ কোটি টাকা যোগ হতে পারে।

আসন্ন বাজেটে যেসব প্রস্তাব দিলেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা

বর্তমানে মোটরসাইকেলের জন্য এককালীন নিবন্ধন ফি ও নির্দিষ্ট সময় পরপর রোড ট্যাক্স দিতে হয়। নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ফিটনেস নবায়ন বা সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার সময় অগ্রিম আয়করও দিতে হবে। আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় এই কর সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, অগ্রিম কর সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত রিকশার মতো অনিবন্ধিত যানবাহনকে করজালে আনা বাস্তবে কঠিন হবে।

বাইক ও ব্যাটারি অটোরিকশাও আসছে করের আওতায়

অন্যদিকে মোটরসাইকেল শিল্প সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, নতুন কর আরোপের ফলে বিক্রি ও উৎপাদন কমে যেতে পারে। দেশে গত এক দশকে মোটরসাইকেল শিল্পে বড় বিনিয়োগ হয়েছে। হোন্ডা, ইয়ামাহা, সুজুকি, বাজাজ ও টিভিএসের বিভিন্ন মডেল এখন দেশে সংযোজন হচ্ছে।

জানতে চাইলে মোটরসাইকেল ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সচিব ও এটলাস ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শামসুল আরেফিন বলেন, তেল সংকটের কারণে তিন-চার মাস ধরে মোটরসাইকেলের বাজারে মন্দা। এখন আবার অগ্রিম আয়কর বসলে আমরা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হব। ক্রেতাদের ওপর খরচের চাপ বেড়ে যাবে। আমরা এনবিআরের সঙ্গে আগেও বসেছি, ঈদের পর আবার বসবো এই কর প্রত্যাহার করতে বলবো।

হোন্ডার চিফ মার্কেটিং অফিসার শাহ মো. আশেকুর রহমান বলেন, এই খাতে সংকট আরও বাড়বে। নিম্ন আয়ের মানুষ যারা কম সিসির মোটরসাইকেল চালান তাদের ওপর প্রভাব পড়বে।

একই সঙ্গে আগামী বাজেটে ভ্যাট ব্যবস্থায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। নতুন নিবন্ধিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্যাকেজ ভ্যাট সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে এনবিআর। যদিও কর্মকর্তারা একে সরাসরি ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ বলতে চান না। তাদের ভাষ্য, নতুন উদ্যোক্তাদের নিবন্ধনে উৎসাহিত করতেই এই ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।

বাইক ও ব্যাটারি অটোরিকশাও আসছে করের আওতায়

এ ছাড়া টিআইএনের মতো তাৎক্ষণিকভাবে অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন বা বিআইএন নেওয়ার সুযোগ চালু হতে পারে আগামী অর্থবছর থেকেই। বর্তমানে বিআইএন নিতে আবেদন ও যাচাই-বাছাইয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। নতুন ব্যবস্থায় ঘরে বসেই অনলাইনে তাৎক্ষণিক বিআইএন নেওয়া যাবে। ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাব খুলতেও বিআইএন বাধ্যতামূলক করা হতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা খুচরায় অনেক মানুষ ব্যবসা করছেন। কেউ কেউ খুব ভালো বেচাকেনা করছেন তারা হয়তো ভ্যাট জালের বাইরে। সেইসব ব্যবসায়ীদের নিয়ম-কানুনের মধ্যে আনতে ভ্যাট নিবন্ধন সহজ করা হতে পারে।

ভ্যাট অব্যাহতির ক্ষেত্রেও আসছে কিছু পরিবর্তন। আগামী বাজেটে হার্টের রিং ও ডায়ালাইসিসের টিউবে ভ্যাট ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে এসব গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জামের দাম কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাইক ও ব্যাটারি অটোরিকশাও আসছে করের আওতায়

অন্যদিকে রডের ওপর ভ্যাট বাড়ানোর চিন্তা করছে সরকার, যা বাড়ি নির্মাণ ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে ফটোস্টুডিও খাতে ভ্যাট বাড়ানোর প্রস্তাব থাকায় ছবি তোলার খরচও বাড়তে পারে। ভোক্তা পর্যায়ে পড়তে পারে এই ভ্যাটের খড়গ।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে দেশে দফায় দফায় বাড়ছে রডের দাম। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বড় ব্র্যান্ডের রডের দাম বেড়েছে প্রায় ১১ থেকে ১২ শতাংশ। এতে টনপ্রতি রডের দাম ৯২ থেকে ৯৮ হাজার টাকায় উঠে গেছে।

জানা যায়, দেড় মাস আগে প্রতি টন রড ৭৮ থেকে ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। বর্তমানে জেডএসআরএম কোম্পানির রড ৯২ হাজার ৫০০ টাকা, এসএস স্টিল ৯২ হাজার টাকা, এইচএম স্টিল ৯৩ হাজার ৫০০ টাকা, কেএসআরএম ও জিপিএইচ ইস্পাত ৯৫ হাজার ৫০০ টাকা, একেএস স্টিল ৯৬ হাজার ৫০০ টাকা ও বিএসআরএম ৯৮ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। 

রিহ্যাবের সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, এ খাতে খরচ বাড়লে নির্মাণ খাত বড় বিপদে পড়ে যাবে। যুদ্ধের প্রভাবে বর্তমানে নির্মাণ শিল্পের সব কাচাঁমালের দামই চড়া। কয়েকমাস ধরে রডের দাম বাড়ছে। এ অবস্থায় রিহ্যাবসহ অন্যান্য সংগঠনের সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজন। 

এদিকে তৈরি পোশাকশিল্পের ঝুট ব্যবসায়ীদের জন্য সুখবর আসতে পারে। বর্তমানে এই খাতে ১০ শতাংশ ভ্যাট দিতে হলেও আগামী বাজেটে তা অব্যাহতির প্রস্তাব রয়েছে।

এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, ভ্যাট সহজীকরণ, নতুন অব্যাহতি, ভ্যাট হার সমন্বয়সহ প্রায় দশটি প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে। সেখান থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পরই আগামী বাজেটে এসব সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সূত্র: জাগো নিউজ