ইতিহাসের কোনো কোনো মাহেন্দ্রক্ষণে শব্দ এবং অস্ত্র একই মোহনায় এসে মিলিত হয়। শব্দ যখন শোষিতের ক্রন্দনকে রূপ দেয় বিদ্রোহের অগ্নিগর্ভ উচ্চারণে, আর অস্ত্র যখন সেই উচ্চারণকে বাস্তবে রূপ দিতে অন্যায়ের বুক চিরে ছিনিয়ে আনে মুক্তির লাল সূর্য-তখন সৃষ্টি হয় এক অবিনাশী মহাকাব্য। বাংলা সাহিত্যের ধূমকেতু, সাম্য ও মানবতার শাশ্বত কণ্ঠস্বর কাজী নজরুল ইসলাম এবং একাত্তরের রণাঙ্গনের দুঃসাহসী যোদ্ধা, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ও আত্মিক সম্পর্ক ঠিক সেই বিন্দুতেই প্রোথিত। প্রথিতযশা কবি ও গবেষক আবদুল হাই শিকদারের সুযোগ্য সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘জাতীয় কবি এবং শহীদ জিয়া’ গ্রন্থটি কেবল দুটি ঐতিহাসিক চরিত্রের সমান্তরাল পাঠই নয়; বরং এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, সংগ্রাম ও স্বাধীনতার অন্তর্লীন দর্শনের এক প্রামাণ্য দলিল।
একটি তাৎপর্যপূর্ণ গ্রন্থের পেছনে প্রয়োজন হয় একজন সংবেদনশীল ও মননশীল সম্পাদকের। আবদুল হাই শিকদার বাংলা সাহিত্যের এমন এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি, যিনি একাধারে কবি, সমাজবীক্ষক এবং অন্যতম প্রধান নজরুল গবেষক। সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় তার অবাধ বিচরণ এবং সমাজ-রাজনীতির গভীর পাঠ তাকে এ গ্রন্থটি সংকলন ও সম্পাদনায় অনন্য অন্তর্দৃষ্টি জুগিয়েছে।
বাংলা একাডেমিতে ‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ’ ও ‘নজরুল মঞ্চ’ প্রতিষ্ঠার পেছনে যার নিরলস শ্রম রয়েছে, তার হাতে নজরুল ও জিয়ার এ মেলবন্ধন গ্রন্থিত হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রাসঙ্গিক। সম্পাদক অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তুলে ধরেছেন-কীভাবে এক পরাধীন জাতির অবদমিত আত্মা নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় প্রথম আত্মজাগরণের ভাষা খুঁজে পেয়েছিল, আর ১৯৭১-এর ঘোর অমানিশায় সেই জাতিই মেজর জিয়ার বজ্রকণ্ঠের ‘‘We revolt’ ধ্বনিতে মূর্ত হয়ে উঠেছিল মুক্তির চূড়ান্ত সংগ্রামে।
গ্রন্থটির মূল সুরটি বাঁধা হয়েছে দ্রোহ ও ন্যায়ের অভিন্ন তন্ত্রীতে। ১৯২১-২২ সালে কাজী নজরুল ইসলাম যখন পরাধীন ভারতবর্ষের তখত কাঁপিয়ে লিখেছিলেন-‘বল বীর-/বল উন্নত মম শির!’, তখন তা কেবল একজন কবির আবেগীয় উচ্ছ্বাস ছিল না; তা ছিল শতাব্দীর শৃঙ্খল ভাঙার এক যুগান্তকারী ইশতেহার। নজরুলই এ উপমহাদেশের প্রথম কবি, যিনি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার সুস্পষ্ট দাবি তুলেছিলেন।
ঠিক অর্ধশতক পর, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর আগ্রাসনের মুখে চট্টগ্রামের কালুরঘাট থেকে তরুণ সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক প্রত্যয়-‘We revolt’। এটি নিছক কোনো সামরিক প্রতিরোধ ছিল না, এ ছিল নজরুলের সেই চির-উন্নত শিরের বাস্তব বহিঃপ্রকাশ। একজন শব্দ দিয়ে জাতির ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে তুলেছিলেন, অন্যজন অস্ত্র হাতে সেই জাগরণকে রূপ দিয়েছিলেন সার্বভৌম রাষ্ট্রে।
গ্রন্থটিতে অত্যন্ত সুচারুভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, এ দুজনের বিদ্রোহ কখনোই ধ্বংসের জন্য ছিল না; তাদের দ্রোহ ছিল সৃষ্টির জন্য, শোষিত মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য এবং একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে।
নজরুলের কাব্যদর্শন ও জিয়ার রাষ্ট্রচিন্তার ভেতরকার যে গভীর ঐক্য তুলে ধরা হয়েছে, তা পাঠককে নতুন করে ভাবতে শেখায়। নজরুল এবং জিয়া-উভয়েই উঠে এসেছিলেন সাধারণ মাটি ও মানুষের গভীরতম স্তর থেকে। ফলে সাধারণ মানুষের বঞ্চনা, তাদের দীর্ঘশ্বাস এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে তারা ধারণ করেছিলেন নিজেদের অস্থিমজ্জায়।
দুই মহামানবের মনস্তাত্ত্বিক মেলবন্ধনকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে চমৎকার রূপকে-একজন যদি হন আমাদের অনুভূতির আকাশ, তবে অন্যজন আমাদের অস্তিত্বের মাটি; একজন যদি হন অফুরন্ত অক্সিজেনের প্রবাহ, অন্যজন তৃষ্ণার্ত আত্মার জন্য বিশুদ্ধ সঞ্জীবনী সুধা।
গ্রন্থটির অন্যতম শক্তিশালী ও প্রামাণ্য দিক হলো কাজী নজরুল ইসলামের জাতীয় স্বীকৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নে শহীদ জিয়ার অবদানকে তথ্যের নিরিখে উন্মোচিত করা। অনেকের কাছেই হয়তো অজানা যে, শহীদ জিয়ার শৈশব-কৈশোর কেটেছিল নজরুলের সুর ও বাণীর এক স্নিগ্ধ আবহে; কারণ তার শ্রদ্ধেয় জননী ছিলেন স্বনামধন্য এক নজরুল সংগীতশিল্পী। ফলে নজরুলের প্রতি তার অনুরাগ ছিল পারিবারিক ও আত্মিক।
রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর জিয়াউর রহমান নজরুলকে কেবল হৃদয়েই ধারণ করেননি, তাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মানের বেদিতে:
১. কবিকে ‘আর্মি ক্রেস্ট’-এ ভূষিত করা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান। ২. প্রয়াণের পর পরম শ্রদ্ধায় বাংলাদেশের মাটিতে তার শেষ শয্যা নিশ্চিত করা-যা ছিল কবির ইচ্ছারই প্রতিফলন। ৩. রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নজরুল চর্চাকে ছড়িয়ে দিতে আজকের ‘নজরুল ইনস্টিটিউট’-এর ভিত্তিপ্রস্তর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান।
গ্রন্থটিতে এ ঐতিহাসিক সত্যগুলোকে গভীর কৃতজ্ঞতা ও প্রামাণ্য তথ্যের সঙ্গে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, যা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য ইতিহাসের উপাদান।
‘জাতীয় কবি এবং শহীদ জিয়া’ গ্রন্থটি কেবল কিছু আবেগঘন প্রবন্ধের সংকলন নয়; এর একটি অনন্য ঐতিহাসিক ও গবেষণাভিত্তিক গুরুত্ব রয়েছে। বইটিতে সংকলিত হয়েছে: নজরুল ইসলাম এবং জিয়াউর রহমানের জীবন ও দর্শনভিত্তিক তাত্ত্বিক আলোচনা। বিভিন্ন সময়ে জাতীয় কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রদত্ত বাণী, রাষ্ট্রাচারের বিবৃতি ও অপ্রচলিত দলিল। শহীদ জিয়া ও নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত কিছু দুর্লভ আলোকচিত্র-যা গ্রন্থটির ঐতিহাসিক আবেদন ও সংগ্রাহক মূল্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
যদিও সম্পাদক তার ‘ভূমিকা’ উল্লেখ করেছেন, সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক বিদগ্ধজনের লেখা অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি এবং কিছুটা মুদ্রণজনিত অপূর্ণতা রয়ে গেছে; তবুও একজন নিরপেক্ষ সাহিত্য সমালোচকের দৃষ্টিতে বলা যায়-এ সংকলনটি নজরুল গবেষণা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের এক অনাবিষ্কৃত দিগন্তকে উন্মোচিত করেছে। এটি নিছক কোনো শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়, এটি দুটি ভিন্ন ধারার মুক্তির চেতনাকে এক মোহনায় মেলানোর এক সফল বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস। বাংলাদেশের সাহিত্য, রাজনীতি ও আত্মপরিচয়ের মেলবন্ধনকে যারা গভীরভাবে বুঝতে চান, তাদের প্রত্যেকের পাঠ তালিকায় এ গ্রন্থটি এক অনিবার্য সংযোজন হিসাবে বিবেচিত হবে।