মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ঢাকা
ফন্টসাইজ A- A A+
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
logo

সামান্য একটি নিয়োগ, বড় এক সামাজিক সংকেত


তৌহিদুল ইসলাম বাদল published:  ১১ আগস্ট, ২০২৬, ০১:৩২ পিএম

সামান্য একটি নিয়োগ, বড় এক সামাজিক সংকেত

ফ্যামিলি কার্ড শুমারি ২০২৬-এর তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে আলোচনা-সমালোচনা, তদবির ও রাজনৈতিক পরিচয়কেন্দ্রিক কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে, তা নিছক একটি অস্থায়ী কাজের নিয়োগ বিতর্ক নয়। এর গভীরে লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজের এক নির্মম বাস্তবতা বেকারত্ব, তীব্র কর্মসংস্থান সংকট এবং সরকারি চাকরির প্রতি যুবসমাজের অস্বাভাবিক নির্ভরতা।

ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সঠিক তথ্য প্রাপ্তির ওপরই যেকোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করে। তাই এ কাজে যোগ্য ও দায়িত্বশীল মানুষ নির্বাচন করা জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন, এটি কোনো স্থায়ী বা উচ্চ গ্রেডের সরকারি চাকরি নয়, বরং নির্দিষ্ট মেয়াদের একটি অস্থায়ী কাজ মাত্র। অথচ এই নিয়োগ ঘিরেই যখন ‘কে কার লোক’, ‘কার সুপারিশ কত ভারী’ কিংবা ‘কে কোন রাজনৈতিক পরিচয়ে সুযোগ পেল’—এমন আলোচনা মুখ্য হয়ে ওঠে, তখন স্পষ্ট হয় যে আমাদের বেকার তরুণদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান কতটা চওড়া।

এখানে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা উল্লেখ করা যায়। আমার এক বন্ধু একজনকে এই কাজে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য সুপারিশের অনুরোধ করেছিল। কিন্তু আমি সচেতনভাবেই কোনো তদবির না করে নিজের জায়গায় সৎ থাকার চেষ্টা করেছি। পরবর্তীতে চূড়ান্ত তালিকায় যখন সেই প্রার্থীর নাম দেখলাম, তখন মনে একধরনের স্বস্তি কাজ করল। মনে হলো, হয়তো কোনো সুপারিশ ছাড়াই সম্পূর্ণ যোগ্যতার ভিত্তিতে সে নির্বাচিত হয়েছে। অন্তত একটি নিয়োগেও যে মেধার মূল্যায়ন সম্ভব, ঘটনাটি সেই আশার আলো দেখায়।

কিন্তু বৃহত্তর প্রশ্নটি থেকেই যায় এত স্বল্পমেয়াদি ও অস্থায়ী কাজের জন্য যদি একজন বেকার তরুণকে সুপারিশ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের দ্বারস্থ হতে হয়, তবে স্থায়ী সরকারি চাকরির নিয়োগব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কোথায় গিয়ে ঠেকবে?

এই সংকটের সঙ্গে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ ও প্রত্যাশা থাকা অস্বাভাবিক নয়। অতীতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে যারা চাকরি, পদোন্নতি, ব্যবসা কিংবা প্রশাসনিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের একটি বড় অংশ মনে করতে পারেন যে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবার তাদের সেই বঞ্চনার ‘ক্ষতিপূরণ’ পাওয়ার সময় এসেছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন ঘটনা কম নয়, যেখানে ভিন্ন মতের কারণে মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, রাজনৈতিক মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন কিংবা রাষ্ট্রীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কোনো নাগরিক যদি অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন, তবে তার প্রতিকার ও নাগরিক ইনসাফ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। এটি কোনো অনুগ্রহ নয়, বরং ন্যায়বিচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তবে এখানেই একটি সূক্ষ্ম সীমারেখা টানা প্রয়োজন। অন্যায়ের প্রতিকার আর নতুন করে অন্যায় সৃষ্টি দুটিকে এক করে দেখা যায় না। অতীতে কেউ রাজনৈতিক কারণে বঞ্চিত হলে তার পুনর্বাসনের জন্য সুনির্দিষ্ট, স্বচ্ছ ও আইনসম্মত প্রক্রিয়া থাকা উচিত। কিন্তু সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ যদি নতুন নিয়োগে দলীয় আনুগত্য কিংবা প্রতিশোধমূলক বিবেচনার মাধ্যমে ঘটে, তবে রাষ্ট্র একটি অন্যায় সংশোধন করতে গিয়ে আরেকটি নতুন অন্যায়ের জন্ম দেবে।

রাজনৈতিক আদর্শ লালন করা নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু রাষ্ট্রীয় চাকরি বা সরকারি সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত মেধা, যোগ্যতা ও আইনসম্মত অধিকার। রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক সম্পদ নয়। অতীতের বঞ্চনার হিসাব মেলাতে গিয়ে যদি বর্তমানের নিয়োগব্যবস্থায় নতুন বঞ্চনার সৃষ্টি হয়, তবে আমরা সমস্যার সমাধান করছি না; শুধু বঞ্চিতের পরিচয় বদলে দিচ্ছি।

সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আমাদের তরুণদের মনস্তত্ত্ব। আমরা কি জেনেশুনে যুবসমাজকে এমন এক ধারণার দিকে ঠেলে দিচ্ছি না, যেখানে জীবনের সাফল্যের একমাত্র সংজ্ঞা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি ‘সরকারি চাকরি’?

মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ কর্মসংস্থান প্রতিটি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার। কিন্তু একজন শিক্ষিত তরুণের মেধা ও সামর্থ্য কি কেবল একটি নিয়োগ পরীক্ষার খাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? ফ্যামিলি কার্ডের মতো একটি অস্থায়ী কাজের জন্য যখন হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণ তীব্র প্রতিযোগিতায় নামেন, তখন রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের ভাবা উচিত—আমরা কি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছি?

বেকারত্ব সমস্যার সমাধান কেবল সরকারি পদের সংখ্যা বাড়িয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন কর্মসংস্থানের বহুমুখীকরণ এবং তরুণদের মানসিকতার আমূল পরিবর্তন। সরকারি চাকরির পাশাপাশি বেসরকারি খাত, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, প্রযুক্তিনির্ভর কাজ, ফ্রিল্যান্সিং, কারিগরি দক্ষতা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগাতে হবে।

বিশ্বের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একজন শিক্ষিত তরুণ শুধু চাকরি খুঁজবেন—এই ধারণা এখন অনেকটাই পুরোনো। তাকে নিজের জন্য এবং অন্যের জন্য কাজ তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। একজন তরুণ যখন নিজের দক্ষতা দিয়ে স্বাবলম্বী হন এবং আরও দুজনের কর্মসংস্থান তৈরি করেন, সেটিই দেশের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন।

এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। তরুণদের শুধু চাকরির বিজ্ঞপ্তির আশায় বসিয়ে না রেখে দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে অর্থায়ন, বাজারসংযোগ এবং ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশিক্ষণের পর একজন তরুণ কীভাবে সেই দক্ষতাকে আয়ে রূপান্তর করবেন, সেই পথ রাষ্ট্রকে দেখাতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকেও সনাতনী ডিগ্রিনির্ভরতা থেকে বের করে দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা ও উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা তৈরির উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।

একই সঙ্গে নিয়োগব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। কাজটি অস্থায়ী হোক বা স্থায়ী ব্যক্তিগত সুপারিশ ও তদবির সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে মেধা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে। একটি স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া শুধু একজন যোগ্য মানুষকে চাকরি দেয় না, বরং রাষ্ট্রের প্রতি হাজারো তরুণের আস্থা পুনর্গঠন করে।

সবশেষে, তরুণদেরও নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। একটি চাকরি না পাওয়া মানেই জীবন ব্যর্থ হওয়া নয়। জীবনের সম্ভাবনা কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষার ফলাফলের ফ্রেমে বন্দি থাকতে পারে না। তরুণদের মনে রাখতে হবে—চাকরি পাওয়ার চেষ্টা থাকবে, তবে তার ওপর জীবনকে স্থবির করে দেওয়া যাবে না। সুযোগের অপেক্ষায় থাকার পাশাপাশি সুযোগ তৈরির চেষ্টাও চালিয়ে যেতে হবে।

ফ্যামিলি কার্ড শুমারির মতো একটি সামান্য অস্থায়ী নিয়োগকে কেন্দ্র করে যে বিপুল উৎকণ্ঠা ও রাজনৈতিক তৎপরতা আমরা দেখছি, তা আসলে একটি বড় সামাজিক সতর্কবার্তা। দেশে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। বেকারত্ব দূরীকরণের লড়াইটি কেবল সরকারের একার নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী মহলের সম্মিলিত দায়িত্ব।

দলীয় পরিচয় যার যার ব্যক্তিগত অধিকার হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সুযোগে যোগ্যতা সবার সমান অধিকার। রাষ্ট্র যখন যোগ্যতার নিশ্চয়তা দেবে, সমাজ যখন সুযোগ তৈরি করবে, আর তরুণরা যখন আত্মবিশ্বাস নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে—বেকারত্ব ও হতাশার অন্ধকার থেকে উত্তরণের আসল পথটি ঠিক তখনই উন্মোচিত হবে।