স্বদেশ বানী ডেস্ক published: ৩০ নভেম্বর, ২০২৫, ০৯:৪০ পিএম

নগদ অর্থবিহীন লেনদেন বা ক্যাশলেস লেনদেন বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে অবকাঠামো নির্মাণ, আধুনিক প্রযুক্তি প্রতিস্থাপন, ডিজিটাল সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার স্থাপন করছে। এ খাতে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো প্রায় ১২ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এর আওতায় এখন শহর থেকে উপজেলা ও কোনো কোনো ইউনিয়ন বা প্রসিদ্ধ ব্যবসাকেন্দ্র পর্যন্ত ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগ প্রসারিত করা হয়েছে। এ সুযোগ আরও বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গ্রাহকদেরকেও ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে নগদ অর্থের লেনদেন কমানো হচ্ছে। কারণ নগদ অর্থের লেনদেনের ক্ষেত্রে নানা ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। এতে দুর্নীতি যেমন হচ্ছে, তেমনি প্রতারণার ঘটনাও ঘটছে। পাশাপাশি জাল নোটের বিস্তার ঘটছে। ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা চালু হলে এসব প্রবণতা একেবারেই বন্ধ হয়ে যাবে। পাশাপাশি নগদ অর্থ ছাপানো ও ব্যবস্থাপনা বাবদ সাশ্রয় হবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগে বড় অঙ্কের লেনদেনকে ডিজিটাল করার পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে সফলতা আসায় এখন ছোট অঙ্কের লেনদেনও ডিজিটাল করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালে ডিজিটাল লেনদেনের সংখ্যা ৩৬ কোটি ৬৭ লাখ থেকে বেড়ে ৪০ কোটি ৩১ লাখে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে টাকার অঙ্কে লেনদেন ৭৫ হাজার ১৪০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৭৬ হাজার ৩৪০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে নগদ লেনদেনও বেড়েছে। আলোচ্য সময়ে নগদ লেনদেন ৩৪ কোটি ৬২ লাখ থেকে বেড়ে ৪৫ কোটি ৪৯ লাখে উন্নীত হয়েছে।
আগে যেখানে লেনদেনের প্রায় ৯০ শতাংশই নগদ অর্থের বিনিময়ে হতো। এখন সেখানে মোট লেনদেনের ৪৫ শতাংশ ডিজিটাল পদ্ধতিতে বা ক্যাশলেসভাবে হচ্ছে। এসব লেনদেন সম্পন্ন করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মোটা অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছে। প্রায় ১০ হাজার ৪২২ ধরনের যন্ত্রপাতি বা অবকাঠামোগত উপকরণ স্থাপন করেছে। এ খাতে বিনিয়োগ প্রায় ১২ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে এখন গ্রাহকরা এটিএম সেবার মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও টাকা তুলতে পারছেন। পাশাপাশি ডিজিটাল পদ্ধতিতে টাকা স্থানান্তর করতে পারছেন।
আগে ব্যবসায়ীরা পাইকারি পণ্য বেচাকেনার টাকা, আত্মীয়স্বজনের কাছে টাকা স্থানান্তর করা হতো নগদ আকারে। এখন এগুলো ডিজিটাল পদ্ধতিতেই করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে নগদ টাকার ব্যবহার কমেছে। বেড়েছে প্লাস্টিক মানি বা ই-মানির ব্যবহার। এতে টাকার ব্যবস্থাপনার খরচও কমেছে। নগদ টাকা ছাপানো, পরিবহণ ও ব্যবস্থাপনায় বছরে খরচ হচ্ছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। নগদ টাকার পরিবর্তে ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা চালু হলে এসব টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি নানা ধরনের জাল-জালিয়াতির ঘটনাও হ্রাস পাবে।
প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ব্যাংক খাতে লেনদেন বাড়ার একটি বড় অংশই হচ্ছে নগদ আকারে। নগদ লেনদেনকে ডিজিটালে রূপান্তর করতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি গ্রাহকদেরকেও সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় লেনদেনের খাতগুলোতে ডিজিটাল লেনদেন করার সুযোগ আরও বাড়াতে হবে। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব ধরনের কেনাকাটার মূল্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিশোধের ব্যবস্থা করার পদক্ষেপ নিয়েছে। মোট লেনদেনের মধ্যে এখনো এগিয়ে রয়েছে এটিএম সার্ভিস। মোট লেনদেনের ৫৩ শতাংশ হচ্ছে এটিএম বুথের মাধ্যমে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে লেনদেন হচ্ছে ৩৪ শতাংশ। এছাড়া কিউআর কোড ও পয়েন্ট অব সেলের মাধ্যমেও লেনদেন বাড়ছে।
বিশেষ করে ছোট লেনদেনগুলো এখনো নগদ আকারে হচ্ছে। যে কারণে ডিজিটাল লেনদেনের হার কমছে। গত বছরের জানুয়ারিতে ডিজিটাল লেনদেনের হার ছিল ৫২ শতাংশ এবং নগদ লেনদেন ছিল ৪৮ শতাংশ। ডিসেম্বরে ডিজিটাল লেনদেন কমে ৪৫ শতাংশ ও নগদ লেনদেন বেড়ে ৫২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে মূল্যমানের দিক থেকে ডিজিটাল লেনদেনে ২৭ শতাংশ এবং নগদ লেনদেন ৭০ শতাংশ ও বাকি লেনদেন অন্যভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
মোট লেনদেনের মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে ৫০০ টাকার নোট। মোট লেনদেনে ২৮ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে এ নোটটি। এরপরেই রয়েছে ১০ টাকা ও এক হাজার টাকার নোট। দুটি নোটই মোট লেনদেনে ১৮ শতাংশ করে ৩৬ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০০ টাকার নোট ব্যবহৃত হচ্ছে মাত্র ৪ শতাংশ, ১০০ টাকার নোট ১৪ শতাংশ, ৫০ টাকার নোট ৭ শতাংশ ও ২০ টাকার নোট ১১ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে।
ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে ই-মানি বা ডিজিটাল মুদ্রা ইস্যুর ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আরোপ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকের হাতে লেনদেনযোগ্য যে পরিমাণে অর্থ থাকবে সেই পরিমাণ অর্থই তারা ই-মানি হিসাবে ইস্যু করতে পারবে। কোনোক্রমেই এর বেশি ই-মানি ইস্যু করা যাবে না। লেনদেনের সব পর্যায়েই যাতে ডিজিটাল মানি ব্যবহৃত হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে লেনদেনের কোনো একটি পর্যায়ে গিয়ে নগদ অর্থ ব্যবহৃত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল লেনদেনকে সত্যিকার অর্থেই ডিজিটাল করতে যাচ্ছে। যাতে কোনো পর্যায়েই আর নগদ অর্থ ব্যবহার করতে না হয়। এজন্য ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে এ খাতে আরও বিনিয়োগ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আর্থিক সেবার আওতায় নেই এমন সব স্থানেও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা পৌঁছে দিয়ে সেগুলোকেও ডিজিটাল করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখা দিয়েছে সাইবার নিরাপত্তা। কারণ ডিজিটাল উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। যে কারণে ওটিপি, পাসওয়ার্ড বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কোডগুলো গোপনীয় থাকছে না। ফলে এগুলো ব্যবহার করে জালিয়াতির ঘটনা এখন বেশি ঘটছে। বিশেষ করে মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত উপকরণ ব্যবহারে যথেষ্ট পরদর্শী নয় এমন গ্রাহকরাই বেশি প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এ ধরনের প্রতারণা বা জালিয়াতির ঘটনা এড়াতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি গ্রাহকদেরকেও সচেতন করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এজন্য গ্রাহকদের সচেতন করতে প্রচারণা বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের নিজস্ব ডিজিটাল সিস্টেমস আরও নিরাপদ করে গড়ে তুলছে। একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে তদারকি জোরদার করা হয়েছে। যাতে ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে গ্রাহকরা বাড়তি সুবিধা পেয়ে এ ধরনের লেনদেনের প্রতি আকৃষ্ট হন। পাশাপাশি এ ধরনের লেনদেনে খরচও অনেক কম। এছাড়াও ডিজিটাল লেনদেনের সব রেকর্ড থেকে যাচ্ছে। এতে করে প্রতারণার সুযোগ কমে যাচ্ছে। এ ধরনের লেনদেনে জাল নোটের কারণে প্রতারণার শিকার হয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার কোনো আশঙ্কা নেই। এতে নগদ অর্থ বহনের প্রয়োজনীয়তা নেই বলে ঝুঁকিও কম। ফলে টাকা ছিনতাই বা ডাকাতির কবলে পড়ার সুযোগ নেই। এ পদ্ধতিতে লেনদেনের কারণে দ্রুত অর্থ স্থানান্তর হয়ে যাচ্ছে। ফলে অর্থনীতিতে টাকার চলাচল বেড়ে যাবে। যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে দ্রুত করবে।
ডিজিটাল পেমেন্ট নিরাপদ এবং সহজ লেনদেনের মাধ্যমে ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে বাড়িয়ে তুলবে। ব্যবসা আরও আনুষ্ঠানিক হয়ে উঠবে, প্রসারিত হবে। দ্রুত লেনদেন হওয়ার কারণে ব্যবসায় গতি বাড়বে। এত সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে আরও উন্নত করবে।
ডিজিটাল লেনদেনের সব ধরনের রেকর্ড সংরক্ষিত থাকে বলে দুর্নীতি এবং অবৈধ অর্থের লেনদেন বহুলাংশে হ্রাস পাবে। কারণ অবৈধ লেনদেনের প্রায় পুরোটাই সম্পন্ন হয় নগদ লেনদেনের মাধ্যমে। এ ধরনের লেনদেনের ফলে সরকারকে রাজস্ব আয় আরও বৃদ্ধি করতে সহায়তা করবে।