বাংলাদেশ, বুধবার, এপ্রিল ২৯, ২০২৬
logo

রাজশাহীর ২৫ উপজেলাকে অতি উচ্চ পানি সংকট এলাকা ঘোষণা


নিজস্ব প্রতিবেদন published:  ২৮ আগস্ট, ২০২৫, ০১:২৮ পিএম

রাজশাহীর ২৫ উপজেলাকে অতি উচ্চ পানি সংকট এলাকা ঘোষণা

পদ্মার দুকূল ছাপিয়ে বিশাল জলরাশি বয়ে যাচ্ছে বঙ্গপোসাগরের দিকে। রাজশাহী অঞ্চলের মহানন্দা, শিবনদী, পাগলা, ছোট যমুনা, আত্রাই, বারনই ও পূণর্ভবায় এখন পানির কমতি নেই। চলতি বর্ষায় পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় দেশের লালমাটির বরেন্দ্রভূমির খাল বিল খাড়ি ডোবাতেও পানি জমেছে।

এরপরও বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষ বিভিন্ন সময়ে বহুমূখী পানি সংকটে ভুগছেন। চিহ্নিত এলাকাগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানি স্তর আশংকাজনকভাবে তলানিতে ঠেকেছে। অধিকাংশ হস্তচালিত নলকূপ কয়েক বছর ধরেই পুরোপুরি অকেজো। বছরের আট মাসই এলাকার খালবিল পুকুর ডোবা খাড়ি নালাতে পানি থাকে না।

এদিকে উপদ্রুত এলাকার মানুষেরা খাবার পানি সংগ্রহ করতে অবর্ণনীয় দুভোর্গের শিকার হয়ে থাকেন। গৃহস্থালির দৈনন্দিন কাজকর্ম ছাড়াও গবাদিপশু পালন ও ফসল ফলাতে সেচের পানি পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠেছে।

বছরের আট মাস রাজশাহীর তিন জেলার উপদ্রুত এলাকাগুলোর কোটি মানুষকে পানির কষ্টে ভুগতে হচ্ছে। এসব এলাকার মানুষের পানি উৎসের একমাত্র ভরসা বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের গভীর নলকূপ। 

উপদ্রুত এলাকাগুলোতে যত্রতত্র ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধ করে একাধিক বিকল্প উৎসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পানি সম্পদ, কৃষি ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাগণ ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।   

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাজধানীর গ্রীণ রোডে অবস্থিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্থার (ওয়ারপো) সম্মেলন কক্ষে জাতীয় পানি সম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির ১৮তম সভায় রাজশাহী অঞ্চলের তিন জেলার ২৫টি উপজেলা এলাকাকে অতি উচ্চ পানি সংকট এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। 

এ সভায় পানি সম্পদ, কৃষি ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা, চারটি মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়াও সহায়ক সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। 

রাজশাহী অঞ্চলের পানি সংকটাপন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর ভূগর্ভস্থ পানিস্তর ও পানির প্রাপ্যতা নিয়ে করা গবেষণার প্রতিবেদনের আলোকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।  

জাতীয় পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্থার (ওয়ারপো) মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (প্রকৌশল) মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন জানান, ২০২০ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত তিন বছরব্যাপী ‘সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিধিমালা-২০১৮ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে জাতীয় পানি সম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটি এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। 

এ গবেষণার অধিভূক্ত এলাকাগুলোতে বহুমূখী পানি সংকটের মাঠ পর্যায়ের চিত্র সভায় তুলে ধরা হয়। গবেষণার ফলাফলে নির্বিচারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন না করে ভূউপরিস্থ পানির উৎস বাড়ানোর ও উপদ্রুত এলাকাগুলোর মানুষের পানি চাহিদা নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। 

ওয়ারপোর এ উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, রাজশাহী অঞ্চলের পানি সংকটাপন্ন এলাকাগুলোতে বরেন্দ্র বহুমূখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বিএডিসি কর্তৃপক্ষকে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন সীমিত রেখে সেচ ও জনগোষ্ঠীর গৃহস্থালির পানির ব্যবস্থা করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে। গবেষণা অধিক্ষেত্রের কোথাও আর নতুন করে গভীর নলকূপ স্থাপন না করার জন্যও বলা হয়েছে। 

বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষের উপস্থিত কর্মকর্তারাও সভায় স্বীকার করেছেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে ক্রমাগতভাবে পানিস্তর নেমে যাওয়ায় তাদের স্থাপিত অনেক গভীর নলকূপে এখন আর পানি উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকী অনেক গভীর নলকূপও অকেজো হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে ওয়ারপোর গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, রাজশাহী অঞ্চলের তিন জেলার বিভিন্ন এলাকায় বছর বছর ভূগর্ভস্থ পানিস্তর নিচে নামছে। এতে নতুন করে আরও সংকট বেড়েছে। 

সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে চলমান সংকট আর কোনোভাবেই বাড়তে দেওয়া যাবে না। ভূগর্ভের সব পানি ফুরিয়ে গেলে আলোচিত উপজেলাগুলোর মানুষ আগামীতে কোনো পানি পাবে না। এলাকাগুলোতে পানির জন্য হাহাকার পরিস্থিতি তৈরি হবে। 

এখনো শুস্ক মৌসুমে রাজশাহীর তানোর, গোদাগাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল গোমস্তাপুর ও সদর উপজেলা ছাড়াও নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর, পোরশা ও সাপাহার উপজেলার অধিকাংশ গ্রামেই তীব্র পানি সংকট বিরাজ করে। 

পানির জন্য সবচেয়ে বেশি দুর্দাশার শিকার হচ্ছেন রাজশাহীর তানোরের অধিকাংশ এলাকার মানুষ। তারা পানির অভাবে তিনদিনে একবার গোসল করার সুযোগ পান। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের ২২টি গ্রামেও পানির তীব্র সংকটে মানুষ সারা বছরই দিন কাটায়। তপ্ত উত্তপ্ত বরেন্দ্রভূমিভুক্ত এসব এলাকার মানুষ পানির অভাবে গবাদিপশু পালন করতে পারে না। বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষের স্থাপিত গভীর নলকূপ থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয় নারীদের।        

জাতীয় পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিষদের সংশ্লিষ্ট সভার অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তাগণের সূত্রে জানা গেছে, সভায় অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন তিন জেলা হলো- রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ। 

এ তিন জেলার ২৫টি উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়নের ৪ হাজার ৯১১টি মৌজার সাড়ে ৫ হাজার গ্রাম পানি সংকটের ঝুঁকিতে পড়েছে। তবে এর মধ্যে ৪৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৫০৩টি মৌজাকে অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উপদ্রুত এলাকাগুলোর ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৮৭ লাখের বেশি। 

ওয়ারপোর মাঠ গবেষণা প্রতিবেদনের আলোকে জাতীয় পানি ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ এ সভায় রাজশাহীর জেলা উপজেলা এলাকাকে তীব্র পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে সংকট নিরসনে পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।    

এদিকে রাজশাহী অঞ্চলের এসব অতি ঝুঁকিপূর্ণ ও উপদ্রুত এলাকায় পানি ব্যবস্থাপনায় ২০১৩ সালের পানি আইনের ১৭ ও ১৯ বিধিমালা বা ধারা কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পানি ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান এ আইন কার্যকরা সম্ভব হলে উপদ্রুত এলাকাগুলোতে যত্রতত্র ভূগর্ভস্থ পানি আর উত্তোলন করা যাবে না। কেউ তা করলে তাদের বিরুদ্ধে পানি ব্যবস্থাপনা আইনানুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে। 

পাশাপাশি জনগোষ্ঠীর খাবার পানি, গৃহস্থালি কাজের জন্য প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে একটি কমিটি আগামী এক মাসের মধ্যে সুপারিশসহ করণীয় চূড়ান্ত করতে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা নির্দেশ দিয়েছেন। 

এদিকে এ বিষয়ে মতামত জানার জন্য বুধবার সকাল থেকে দিনের বিভিন্ন সময় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোন নম্বরে এবং অফিসের নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কেউ ফোন ধরেননি। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এ সরকারি সিদ্ধান্তের বিষয়ে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কারো মতামত জানা সম্ভব হয়নি। 

বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ তাদের ১৫ হাজার ৫৯৮টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে সেচের পানি বিক্রি করে থাকেন কৃষকদের কাছে